
পাশাপাশি গ্রামে বসবাস, একই পথে একই স্কুলে পড়ালেখা। দীর্ঘদিন একসাথে স্কুলে যাওয়া-আসা আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। এরই মাঝে দু’জনের অন্তরে মনের আদান-প্রদান। একসময় ভালোবাসার টানে উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে। বলছিলাম জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার রতনপুর (নয়াপাড়া) গ্রামের মোঃ জাহিদুল মোল্লা ও পার্শ্ববর্তী চকশিমুলিয়া গ্রামের হোসনে আরার কথা। বিয়ের পর তাদের সংসার আলোকিত করে আসে দুই সন্তান মেহেদী হাসান ও মাহমুদুল হাসান। সুখ সাগরেই চলছিল তাদের জীবন সংসার।
কিন্তু প্রবাদ আছে, সুখ সবার কপালে বেশিদিন স্থায়ী হয় না। হঠাৎ করেই ব্লাড ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন জীবনসঙ্গী জাহিদুল মোল্লা। মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ে হোসনে আরার। তবে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে দুই সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রামে নেমে পড়েন। এক হাতে সংসারের হাল ধরেন, অন্য হাতে ছেলেদের পড়ালেখায় জোর দেন। মায়ের সেই কষ্টকে বৃথা যেতে দেয়নি ছেলেরা। পড়ালেখা শেষে দুই ছেলেই আজ সরকারি চাকরি করছেন। বড় ছেলে মেহেদী হাসান মায়ের সার্বিক পরামর্শ ও উৎসাহে পাঁচবিবি শহরের লাঙ্গলহাটিতে ফ্ল্যাট বাসা নির্মাণ করে গড়ে তোলেন ৫-৬’জন যুবকের কর্মসংস্থানের পথ।
মায়ের শ্রম, ইচ্ছাশক্তি ও সাধনাকে সম্মান জানাতেই ছেলে প্রতিষ্ঠানের প্রোপাইটর সহ সবকিছুতেই মায়ের নাম দিয়েছেন। গর্ভধারিনী মা ছেলেদের সমাজের পরিচিতি করতে প্রতিষ্ঠানটির নাম দেন ২’ভাইয়ের নামের শেষ অংশ দিয়েই প্রতিষ্ঠানের নাম দেন “হাসান ডিজিটাল প্রিন্ট এন্ড অফসেট প্রেস”।
সংগ্রামী এই নারী উদ্যোক্তা ছেলেদের সহায়তায় গড়ে তোলেন একটি বহুমুখী প্রতিষ্ঠান। যেখানে নিজস্ব ডিজিটাল প্রিন্টার ও অফসেট ছাপা মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানে একই ছাদের নিচে করা হয় ব্যানার, ফেস্টুন, সাইনবোর্ড, স্টিকার, প্যানা ফ্লেক্স, লাইটিং সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, পোস্টার, লিফলেট, রিফ্লেকটিভ স্টিকার, মগ প্রিন্ট, গেঞ্জি ও জার্সি প্রিন্ট, বিয়ের কার্ড, ভিজিটিং কার্ড, প্লাস্টিক আইডি কার্ড, ক্যাশ মেমো, রশিদ বই, প্যাড, দাওয়াত কার্ড, হালখাতা কার্ড, হ্যান্ড বিল, বক্স ক্রেস্ট, কাঠ ক্রেস্ট, গ্লাস ক্রেস্ট, মেডেল, ট্রফি, সিল, ফ্ল্যাশ সিল, ফটোকপি সহ নির্বাচনী ও ওয়াজ মাহফিলের সকল প্রকার প্রিন্টিং এর কাজ।
বড়ছেলে মেহেদী হাসান বলেন, “ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। মায়ের আদর-যত্ন আর ভালোবাসায় আমরা দুই ভাই বড় হয়েছি, লেখাপড়া শিখেছি। মায়ের মেধা, পরিশ্রম ও উৎসাহেই আজ এতকিছু। আমার মা একজন সফল নারী উদ্যোক্তা বলে আমি মনে করি।
এলাকাবাসীর মতে, স্বামী হারিয়েও যে নারী ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সন্তানদের মানুষ করতে পারে এবং নিজে উদ্যোক্তা হয়ে অন্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে হোসনে আরা তারা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
Leave a Reply