
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহোদর কোটায় তিন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে জালিয়াতি ও সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে মিথ্যা তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রতারণার প্রমাণ পেয়েছে উপজেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে জেলা প্রশাসন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভর্তির ক্ষেত্রে তিন শিক্ষার্থীর সঙ্গে বিদ্যালয়ে আগে থেকে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সহোদর হিসেবে দেখানো হলেও তাদের বাবার নাম আলাদা। বিদ্যালয়ের ভর্তি রেজিস্টার, হাজিরা খাতা ও ফলাফলপত্র যাচাই করে এ জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর গত ১০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠান।
রোববার (১১ অক্টোবর) জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, এখনো পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সংক্রান্ত কোন আদেশ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন গত ২৭ জুলাই অভিযোগটি তদন্তে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এম এ কাদেরকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেন। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল কবীর ও উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. অনিক রহমান। কমিটি সরেজমিন তদন্ত শেষে ১৬ আগস্ট ইউএনওর কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে ২৪ আগস্ট প্রতিবেদনটি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নবম শ্রেণিতে ওয়াসি চৌধুরী নামে এক শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়। তাঁর বাবা মো. ওয়ালি উল্লাহ চৌধুরী। অথচ সহোদর হিসেবে দেখানো হয় একই শ্রেণিতে পড়ুয়া সাদাদ চৌধুরীকে, যার বাবার নাম মো. আলী হোসেন চৌধুরী। একইভাবে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয় মারিয়া আক্তার মিমকে। তাঁর বাবা মঞ্জুরুল হক। মিমের সহোদর হিসেবে দেখানো হয় অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ কণককে, যার বাবার নাম এনায়েত কবির।
এ ছাড়া সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া মাহফুজা হাসানের সহোদর হিসেবে দেখানো হয় দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাইমিন চৌধুরীকে। মাহফুজার বাবার নাম মাহমুদ হাসান হলেও মোহাইমিনের বাবার নাম মাহবুব হোসেন চৌধুরী। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন শিক্ষার্থীর ভর্তি কার্যক্রমে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ, সহকারী শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক ও আব্দুল মালেক আকন্দের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শিক্ষকদের দেওয়া সহোদর-সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতেই অভিভাবকেরা হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশনে এমন তথ্য উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা প্রত্যয়নপত্রে নিজেদের স্বাক্ষর করার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে জালিয়াতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার দায় নিয়ে প্রধান শিক্ষক ও দুই শ্রেণিশিক্ষক পরস্পরের ওপর দায়িত্ব চাপিয়েছেন।তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রত্যয়ন পত্রগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও অভিভাবকেরা জালিয়াতির দায় এড়াতে পারেন না। আর তথ্য যাচাই না করে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হলেও তা শিক্ষকদের দায়িত্ব ও পেশাদারত্বে গুরুতর অবহেলা। এ ছাড়া ভর্তিকৃত তিন শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের সঙ্গে তাঁদের সহোদর হিসেবে দেখানো শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের যোগসাজশ থাকতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এ ঘটনায় শুধু অন্য ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়নি, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও শিক্ষাব্যবস্থার মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের হাইকোর্ট বিভাগের কাছে মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রতারণা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে তদন্ত কমিটি। জেলা প্রশাসকের চিঠিতে তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, সহোদর কোটায় তিন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে প্রতারণা ও জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে সহকারী শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক ও আব্দুল মালেক আকন্দের দাবি, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কথায় তাঁরা কাগজপত্র যাচাই না করেই স্বাক্ষর করেছিলেন। স্বাক্ষর না করলে বিদ্যালয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা ছিল বলেও তাঁরা জানান। এ বিষয়ে জানতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। উল্লেখ্যা- গত মার্চে বিদ্যালয়ের সরঞ্জামাদি না কিনেই সাড়ে ৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদের বিরুদ্ধে। পরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তদন্তে সেটি প্রমাণিত হয়। কিন্তু কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
Leave a Reply