
শরীয়তপুরের সখিপুরে কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় চুরির অপবাদে এক তরুণীসহ তার ভাইবোনকে কয়েক ঘণ্টা একটি ঘরে আটকে রেখে মারধর, গাছে বেঁধে নির্যাতন এবং তরুণীর মাথার চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
গত মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডে হাজি শরীয়তউল্লাহ কলেজ সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ওই দিন রাতেই ভুক্তভোগীদের মা ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে সখিপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন।
পুলিশ জানায়, সখিপুরের ছৈয়াল কান্দি এলাকার মুদি দোকানদার আবুল মোল্লার ছেলে মনির মোল্যা (২৫) দীর্ঘদিন ধরে তরুণীকে (১৮) উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন এবং মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন কুপ্রস্তাব দিতেন। এতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করেন অভিযুক্ত মনির। এ ঘটনায় স্থানীয়রা মনির মোল্লাকে একাধিকবার সতর্ক করে। ঘটনার দিন ৪ আগস্ট সকাল ৮টায় ভুক্তভোগী তরুণী তার বোন মারিয়া আক্তার (১৩) ও ভাই ফাহিমকে (৭) নিয়ে মনির মোল্লার মুদি দোকানে কেনাকাটা করতে যাচ্ছিলেন। এ সময় অভিযুক্ত মনির তাদের দোকানের সামনেই ওই তরুণীকে নানাভাবে অশালীন কথাবার্তা বলতে থাকেন। এতে প্রতিবাদ জানালে মনির ওই তরুণীসহ তার ভাই-বোনদের দোকানের পাশে ফৌজিয়া সরদারের বাড়িতে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রেখে হাত-পা বেঁধে শারীরিক নির্যাতন করেন। একপর্যায়ে তাদের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে চুরির অপবাদ দিয়ে মনির, আফসানা, ফৌজিয়া সরদার ও নিশি সরদারসহ কয়েকজন গাছের সঙ্গে বেঁধে প্রথমে মারধর করে, পরে মাথার চুল কেটে জুতার মালা পরিয়ে নির্যাতন করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে দুপুর ১২টার দিকে সখিপুর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ভুক্তভোগী তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
গতকাল শুক্রবার (৮ আগস্ট) বিকালে বিস্তারিত জানতে ভুক্তভোগীদের বাড়িতে গিয়ে তাদের পাওয়া যায়নি। তারা ফোনে জানান, নিরাপত্তার কারণে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে পুরো পরিবার।
ভুক্তভোগী তরুণীর মা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মনির আমার মেয়েকে বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দিচ্ছিল। এর আগে আমি তাকে নিষেধ করাতে কিছুদিন চুপ ছিল। মঙ্গলবার সকালে আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলে বাজার করতে মনিরের দোকানে যায়। এ সময় মনির আমার বড় মেয়েকে রাতে দেখা করার প্রস্তাব দেয়। আমার মেয়ে প্রতিবাদ করলে তাকেসহ আমার আরও দুই সন্তানকে জোরপূর্বক দোকানের পাশে ফৌজিয়ার বাড়িতে নিয়ে একটি রুমে আটকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করে। ছোট মেয়ে ও ছেলেকে রশি দিয়ে পাশের রুমে বেঁধে রাখে। এরপর চিৎকার দিলে লোকজন এলে তাদের চোর অপবাদ দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে মনির, আফসানা, ফৌজিয়া সরদার ও নিশি সরদার মারধর করে মাথার চুল কেটে দেয়। পরে পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে। আমাকে মনির ফোন করে বলে তোর মেয়েকে এসে নিয়ে যা। আমি গিয়ে দেখি আমার তিন সন্তানকে মারাত্মক জখম করে বেঁধে রেখেছে। পরে পুলিশ বলল আগে চিকিৎসা করান, পরে থানায় এসে অভিযোগ দিয়েন। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই। আমার সন্তানদের মতো যেন কোনো সন্তানকে এভাবে মারধর করা না হয়।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী তরুণী বলেন, মনির আমাকে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন কুপ্রস্তাব দিত। আমি এড়িয়ে যেতাম। ঘটনার দিন সকালে আমি দোকানে কেনাকাটা করতে গেলে আমাকে রাতে দেখা করার প্রস্তাব দেয়। আমি প্রতিবাদ করলে আমাকেসহ আমার ভাইবোনকে জোরপূর্বক দোকানের পাশে ফৌজিয়ার বাড়িতে নিয়ে যায়। আমাকে পাশের রুমে নিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করে। আমি চিৎকার দিলে এলাকাবাসী এগিয়ে এলে মনির বলে আমি নাকি চুরি করছি এই জন্য আমাকে আটকে রাখছে। এরপর মনির, আফসানা, ফৌজিয়া সরদার ও নিশি সরদার আমাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে ও চুল কেটে দেয়। পরে দুপুরে পুলিশ এসে আমাকে উদ্ধার করে। আমি প্রশাসনের কাছে এই ঘটনার ন্যায়বিচার চাই।
এ বিষয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত মনির মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ভিডিওতে মারধর করতে দেখা যাওয়া অপর অভিযুক্ত আফসানা, ফৌজিয়া সরদার ও নিশি সরদার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোফাজ্জল হুসাইন বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Leave a Reply