
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের নিয়ে আবারও নতুন করে তীব্র বিতর্ক ও জনমনে প্রশ্নের ঝড় উঠেছে।
বিভিন্ন সূত্র ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা “বিদেশ ভ্রমণ”-এর আড়ালে শীগ্রই দেশ ছাড়তে পারে বলে খবর পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন নীতিনির্ধারকের বিদেশযাত্রা, পাসপোর্ট সংক্রান্ত আলোচনা এবং প্রশাসনিক নীরবতা জনমনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত করেছে।
অভিযোগ ও অনিয়মের আড়ালে চাপা প্রশ্ন
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ পর্যায়ে ও পরবর্তী সময়ে একাধিক উপদেষ্টা ও তাদের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধেঃ—
প্রশাসনিক নিয়োগে প্রভাব খাটানো
টেন্ডার ও প্রকল্প বণ্টনে অনিয়ম
ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ
নীতিনির্ধারণে স্বার্থসংশ্লিষ্ট হস্তক্ষেপ
এসব অভিযোগ বিভিন্ন মহল থেকে সামনে আসে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শত শত দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যালয়ে। দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যে এই উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে এসব লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, যে হারে অভিযোগ আসছে তাতে মনে হচ্ছে, অভিযোগের রেকর্ড হবে। অধিকাংশ অভিযোগে অভিযোগকারীর নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে কয়েকটি অভিযোগে নাম-পরিচয় উল্লেখ করেই লিখিত চিঠি দেওয়া হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, দুদক অন্য সব অভিযোগ যেভাবে যাচাই করে, এসব অভিযোগও একইভাবে যাচাই করা হবে।
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সূত্র জানিয়েছে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের অভিযোগ। গ্রামীণ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, ড. ইউনূস কীভাবে নিজের নামে একটি ট্রাস্ট করে গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ টেলিকমের অর্থ আত্মসাৎ করছেন, তার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
এই অভিযোগে বলা হয়েছে, আয়কর ফাঁকি এবং অর্থ আত্মসাতের জন্য ড. ইউনূস তাঁর নিজের নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করেছেন। এই ট্রাস্টের একমাত্র কাজ হলো ড. ইউনূসের পরিবারের দেখাশোনা করা। এভাবে ড. ইউনূস বিপুল পরিমাণ আয়কর ফাঁকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে ড. ইউনূস বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন বলেও একাধিক অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের এক ডজনের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—মামলা বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য, বিচারক পদায়ন এবং অন্যান্য দুর্নীতি।
একটি অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, আসিফ নজরুল জামিন বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই অভিযোগে একটি শিল্প গ্রুপের সিইও, জালিয়াতির মাধ্যমে ভাই এবং বোনের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেন। ছোট বোন তার বিরুদ্ধে মামলা করে, পিবিআই মামলাটি তদন্ত করে জালিয়াতির প্রমাণ পায়।
আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। কিন্তু আসিফ নজরুল ২০ কোটি টাকা নিয়ে ভিআইপি আসামিকে জামিন দেওয়ার নির্দেশ দেন। গান বাংলা টেলিভিশনের তাপসের জামিন আসিফ নজরুল বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে করিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ সংক্রান্ত তথ্যও অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এভাবে আসিফ নজরুল ১৮ মাসে টাকার বিনিময়ে বহু জামিন করিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে পদায়নে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। ঢাকা এবং আশপাশের এলাকায় বিচারক বদলিতে ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রার পদায়নে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে।
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে অন্তত আটটি অভিযোগ জমা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ অন্যতম। এছাড়াও অন্যের সম্পত্তি জোর করে দখলের অভিযোগও রয়েছে। একটি অভিযোগে তার স্বামীর বিষয়েও উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বিরুদ্ধে সামিট গ্রুপের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির সঙ্গে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি, হাসপাতালের কেনাকাটায় অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে।
দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ অভিযোগই ভুক্তভোগীরা নাম-ঠিকানাসহ করেছেন। ঘুষ নিয়ে কাজ না দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে তথ্য-প্রমাণও দেওয়া হয়েছে।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার এবং বেআইনি বিটকয়েন লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ করেছেন একজন। এভাবে প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই অভিযোগ জমা পড়েছে। দুদকের সূত্রগুলো বলেছে, এসব অভিযোগ তারা যাচাই-বাছাই করছে। যেসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাবে, সেগুলো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হবে।
জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যদি তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক দুর্নীতির তথ্য পাওয়া যায় এবং সেগুলো আমলযোগ্য হয়, তবে তা তদন্ত করা উচিত। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগের সত্যতা পেলে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে
বিশ্লেষকদের মতে, “অস্বচ্ছ সম্পদ বিবরণী প্রকাশ না হওয়া” এবং দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য গোপন রাখার প্রবণতা জনআস্থার সংকট আরও বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি একাধিক সাবেক উপদেষ্টার বিদেশ সফর এবং বিদেশে অবস্থানের খবর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
গোপন সূত্র থেকে জানা গেছেঃ—
ব্যক্তিগত সফরের নামে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান
বিদেশে নতুন কর্মসংস্থান বা একাডেমিক যুক্ত হওয়ার চেষ্টা
কূটনৈতিক বা বিশেষ পাসপোর্ট ব্যবহারের পর অনির্দিষ্টকাল অনুপস্থিতি
এ ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে দাবি উঠছে—আরও কয়েকজন উপদেষ্টা পর্যায়ক্রমে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনায় আছেন।
চলতি বছরের আগস্টকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, আগস্ট মাসকে ঘিরে প্রশাসনিক রদবদল ও বিচারিক তদন্তের গতি বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই কিছু সাবেক নীতিনির্ধারক আগেভাগে দেশ ছেড়ে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে খবর রয়েছে।
স্বচ্ছতার প্রশ্নে প্রশাসনের নীরবতা
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি শুরু থেকেই যে প্রধান প্রত্যাশা ছিল—স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা—সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে।
সম্পদ বিবরণী প্রকাশে বিলম্ব, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ধোঁয়াশা এবং নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে অস্পষ্টতা—সব মিলিয়ে জনমনে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের ঘিরে তৈরি হওয়া এই নতুন বিতর্ক দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও উত্তাপ ছড়িয়েছে।
Leave a Reply