মার্চ মাসেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এটা হাই পাওয়ার মানি, ছাপানো টাকা। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) মুখ্য অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাজধানীর বনানীতে পিআরআইয়ের নিজস্ব কার্যালয়ে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে এ কথা বলেন আশিকুর রহমান। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে আশিকুর রহমান বলেন, আমরা সংস্কার থেকে পিছিয়ে গেলে সেটা আত্মঘাতী হবে। আশা করছি, সরকার ব্যাংক রেজোল্যুশন পর্যালোচনা করবে। সংস্কার থেকে পিছিয়ে এসে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় টেনশন সৃষ্টি করেছে।
আশিকুর রহমান বলেন, গত ১৮ মাসে (ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি ভঙ্গুর পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৪ সালের শেষদিকে ১৮ বিলিয়ন ডলার থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। গত পাঁচ মাসে ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি দ্বি-অঙ্কে পৌঁছেছে। যা আর্থিক খাতে আস্থার কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই পুনরুদ্ধার কিছু মৌলিক দুর্বলতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র তিন শতাংশে, যা কোভিড সময়ের পর সর্বনিম্ন। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশে পৌঁছানোয় আর্থিক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ছয় শতাংশে নেমেছে। পাশাপাশি রাজস্ব খাতে পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় সরকার উচ্চ সুদের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
আশিকুর রহমান বলেন, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নও নিতে হচ্ছে। ফলে এই ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন তিনটি সমসাময়িক বহিরাগত চাপের মুখে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, আসন্ন এলডিসি উত্তরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তা। এসব চাপ জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রবাহের দুর্বলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাতের মাধ্যমে অর্থনীতির সর্বস্তরে প্রভাব ফেলছে। একইসঙ্গে রপ্তানি কমে যাওয়া ও জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে, আর সীমিত নীতিগত সক্ষমতা সামগ্রিক ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে রাজস্ব ও আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার থেকে সরে আসা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আইএমএফ কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তাও আন্তর্জাতিক অংশীদার ও বাজারের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এটি অনেকাংশেই স্ব-সৃষ্ট চাপ’ যা বর্তমান সময়ে দেশের পক্ষে বহন করা কঠিন বলে জানান আশিকুর রহমান।
আশিকুর রহমান আরও বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন সতর্ক, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, যেখানে রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে বিচক্ষণতা অপরিহার্য। স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত করতে পারে। একইসঙ্গে কাঠামোগত সংস্কারকে কেবল আইএমএফের শর্ত হিসেবে নয়। জাতীয় অর্থনৈতিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বিনিয়োগ নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখনই দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে জানিয়ে অনুষ্ঠানে আইসিসির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, তাঁরা গ্যাস–বিদ্যুৎ পাবেন কি না, সেই চিন্তা করছেন। সরকার ও ব্যবসায়ীদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে রয়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া এবং বিদ্যমান শক্ত ভিত্তিকে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি।
জ্বালানি প্রভাব প্রসঙ্গে পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার বলেন, সব জিনিসের দামের ওপরে জ্বালানির প্রভাব রয়েছে। হরমুজ ইস্যুতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেই চাপ পড়ছে। তাই নির্বাচিত সরকারকে বড় সংস্কারের দিকে যেতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একটি মৌলিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেসব দেশ এই ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারাই এখন সেই নিয়ম লঙ্ঘন করছে। ফলে এই ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আমরা সম্ভবত একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি, যা আরও বহুমুখী, এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হলে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে।
পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক প্রভাব ফেলছে। এটি বিশ্ব বাণিজ্য ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং বাণিজ্য প্রবৃদ্ধিও ২ থেকে ৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আরও কমার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ এর প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি মজুত বর্তমানে প্রায় তিন মাসের চাহিদা মেটানোর মতো, যা একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা। জ্বালানির পাশাপাশি সার ও খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাঘাত, বিনিময় হার ধাক্কা, শুল্ক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ একাধিক অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলা করেছে। এর সঙ্গে এখন মধ্যপ্রাচ্য সংকট যুক্ত হয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশ হতে পারে এবং গভীর সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে তা ৭ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত হওয়া সম্ভব। তবে বর্তমান বাস্তবতায় ২০২৬ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৭ থেকে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি একটি যুক্তিসংগত প্রত্যাশা।
আইএমএফ কর্মসূচি প্রসঙ্গে পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, চূড়ান্ত কিস্তি প্রাপ্তি নির্ভর করছে বিনিময় হার সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক খাত সংস্কার এবং সামষ্টিক স্থিতিশীলতা অর্জনের ওপর। যদিও বৈদেশিক খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে এখনও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে।
পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, ২০২৬ অর্থবছরে রপ্তানি পাঁচ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে আমদানি ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আংশিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ৭ থেকে ৮ শতাংশ আমদানি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, কারণ আমদানি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানির জন্য অপরিহার্য উপকরণ সরবরাহ করে।
আমদানি নীতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের আমদানি-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। রপ্তানি সম্প্রসারণে আগ্রহী হলে উৎপাদন সংশ্লিষ্ট আমদানিতে উদারতা আনতে হবে। তিনি জানান, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম, যা আগের তুলনায় উন্নতি নির্দেশ করে।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ডেপুটি হেড অব মিশন ক্লিনটন পবকে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
প্যানেল আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বেশিরভাগ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ‘আত্মসৃষ্ট’ এবং সাহসী, দেশীয় উদ্যোগে পরিচালিত সংস্কার জরুরি। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিআইজিডি’র ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো খন্দকার শাখাওয়াত আলী আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো ও অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপানোর মতো মূল্যস্ফীতিমূলক পদক্ষেপ এড়ানোর ওপর জোর দেন। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক তানজিমা মোস্তফা রপ্তানি বৈচিত্র্যে জাহাজ শিল্পের অপার সম্ভাবনা ও এর জন্য উন্নত অর্থায়ন ও নীতি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
পিআরআইর গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ২০৩৪–৩৫ সালের পর বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সুবিধা হ্রাস পেতে পারে, তাই এখনই উৎপাদনশীল সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি কেন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হচ্ছে না তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করা জরুরি, যাতে রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং আর্থিক পরিসর সম্প্রসারিত হয়।