নেত্রকোনায় প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় একটি বর্জ্য শোধনাগার। কথা ছিল এই প্রকল্পের মাধ্যমে বর্জ্য শোধন করে পরিবেশ দূষণ রোধ করা হবে, পাশাপাশি পচনশীল বর্জ্য থেকে তৈরি করা হবে জৈবসার। সেই সার বিক্রি করে বাড়ানো হবে প্রাতিষ্ঠানিক আয়। এ লক্ষ্য নিয়েই ২০২৪ সালে নেত্রকোনা পৌরসভার বাহিরচাপড়া এলাকায় শুরু হয়েছিল প্রকল্পটির যাত্রা। কিন্তু ঘটা করে উদ্বোধনের পরদিন থেকে আজ পর্যন্ত এটি অচল। বিষয়টি দেখার জন্য নেত্রকোনা-২ (নেত্রকোনা সদর- বারহাট্টা) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডাঃ আনোয়ারুল হক পরিদর্শন করেন। শোধনাগারের বদলে সেখানে এখন শুধুই ময়লার ভাগাড়। জায়গাটিকে এখন স্থানীয়রা ‘ময়লাকান্দা’ নামে ডাকেন। নেত্রকোনা পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীন ইউজিআইপি-৩ প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালে স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণ ও বিদ্যমান মলস্লাজ শোধনাগার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পৌর এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাহিরচাপড়া এলাকার চার একর জায়গার ওপর প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটির কাজ শেষ হয় ২০২৪ সালে। এরপর ওই বছরের ২৭ এপ্রিল ঘটা করে প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের পরদিন থেকে এখন পর্যন্ত শোধনাগারটি চালু হয়নি। শোধনাগারের কোনো সরঞ্জামও সেখানে নেই।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় সীমানাপ্রাচীর ও একটি ছোট ভবন ছাড়া আর কিছুই নেই। ভবনটিও পরিত্যক্ত। চারপাশে ছড়িয়ে আছে আবর্জনার স্তূপ। শহর থেকে নিয়মিত ট্রাকে করে প্লাস্টিক, পলিথিন, বাজার ও গৃহস্থালির বর্জ্য নিয়ে সেখানে ফেলা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সব ধরনের বর্জ্য একসঙ্গে ফেলার কারণে ডাম্পিং এলাকাটি রীতিমতো ভরে গেছে। এদিকে পচনশীল বর্জ্য থেকে সারা ক্ষণ তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বর্জ্যের স্তূপে ঘুরে বেড়াচ্ছে কুকুর, শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণী। এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব আর পরিবেশদূষণের কারণে তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। একটু বাতাস হলেই আর টেকা যায় না। স্থানীয় বাসিন্দা জুলহাস মিয়া বলেন, ‘অনেক টাকা ব্যয় করে এখানে বাসা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু এখন দুর্গন্ধ আর পরিবেশদূষণে টিকতে পারছি না। এই এলাকায় কোনো ভাড়াটে এসে থাকতে চায় না। আত্মীয়স্বজনরা পর্যন্ত আসেন না। আমাদের এসব কষ্টের কথা কাকে বলব।আতাউর রহমান নামে একজন বলেন, ‘এখন আর এখানে কেউ জায়গা-জমি কিনতেও আসেন না। কারণ জায়গাটির নাম হয়েছে ময়লাকান্দা।’ গৃহিণী সখিনা বেগম বলেন, ‘পরিবারে সব সময় অসুখ লেগেই থাকে। দুর্গন্ধের কারণে ঠিকমতো খাবারও খেতে পারি না। নাকে এখন আর কোনো গন্ধই টের পাই না।
এদিকে শোধনাগারটি চালু না হওয়ায় এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে শহরের নাগরিক জীবনে। নির্ধারিত এই ভাগাড় ছাড়াও শহরের যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে জেলা শহরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মগড়া নদী আরেকটি আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হতে যাচ্ছে। থানার মোড়, নাগড়া, সাতপাই, আনন্দবাজার, মোক্তারপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে মগড়া নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে আবর্জনার ভাগাড়। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব আবর্জনা গিয়ে পড়ছে নদীতে। ফলে নদীর পানি আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘জনউদ্যোগ’-এর আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী বলেন, ‘আধুনিক বর্জ্য শোধনাগারের কাজ কেবল এক জায়গায় ময়লা জমিয়ে রাখা নয়। বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই, শোধন ও পুনর্ব্যবহারের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা থাকতে হয়। এখানে সেই ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়নি। তাই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল নিয়োগ করে প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা দরকার। এ ব্যাপারে নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘শোধনাগারটি চালু হলে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় শোধন করা যাবে। তা ছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পচনশীল অংশ থেকে জৈবসার তৈরি করে বিক্রি করা যাবে। এ জন্য দরকার পর্যাপ্ত জনবলসহ অত্যাধুনিক সরঞ্জাম। আপাতত সে সক্ষমতা নেই। পৌরসভার প্রশাসক মুনমুন জাহান লিজা বলেন, ‘প্রয়োজনীয় জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে পৌরবাসী প্রকল্পটির সুফল পাচ্ছেন না। আমরা এটি চালু করার কথা ভাবছি।
এ বিষয়ে নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডাঃ আনোয়ারুল হক বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করে সমাধান করার ব্যবস্থা করবো।