ইট-পাথর আর বহুতল ভবনের ভিড়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৭০'বছরের পুরনো একটি মাটির বাড়ি। ভেঙে ফেলে আধুনিক পাকা বিল্ডিং করার সুযোগ থাকলেও বাবার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে রেখেছে একমাত্র ছেলে। জয়পুরহাটের পাঁচবিবি পৌর শহরের দমদমা মহল্লার এই বাড়িটিই এখন এলাকার দৃষ্টিনন্দন এক নিদর্শন।
১৯১৮ সালের দিকে দমদমা মহল্লার সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ডাঃ এ টি এম আব্দুর রহমান। ডাক্তারি পেশায় পড়াশোনা শেষে ব্রিটিশ আমলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরকারি হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সংসার জীবনে তার ৩ মেয়ে ও একমাত্র ছেলে। তিনি সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ১৯৬০ সালের দিকে দমদমায় বারান্দাসহ ৩ রুম বিশিষ্ট মাটির বাড়িটি নির্মাণ করেন। জীবদ্দশায় পরিবার নিয়ে এই শান্তির নীড়েই বসবাস করেন পাঁচবিবির এই কৃতি চিকিৎসক। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭৬ সালে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পেশা চিকিৎসা পেশার এই গুণীব্যক্তিটি সবার মায়া ত্যাগ করে পরোপারের যাত্রী হন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া লিল্লাহি রাজিউন)।
ডাঃ আব্দুর রহমানের ৩ মেয়েই সুশিক্ষিত। বিয়ের পর তারা অন্যত্র বসবাস করছেন। বাবা-মা না থাকায় মাঝে মাঝে ছাড়া বাড়িতে তেমন মেয়েদের আসা হয় না। ফলে আগের মতো মাটির ঘরে শান্তির ঘুমও আর ঘুমানো হয় না একসাথে সবার।
বাবার রেখে যাওয়া স্মৃতি ধরে রেখেছেন একমাত্র ছেলে এ টি এম জাহিদুর রহমান রানা। পড়াশোনা শেষে সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাবার তৈরি ওই মাটির বাড়িতেই বসবাস করছেন। পাশাপাশি বাবার সম্পত্তির দেখভালও করছেন। ছাত্রজীবন থেকেই ফুটবল ও ক্রিকেট খেলাধুলার প্রতি ঝোঁক ছিল তার। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পাঁচবিবি ক্রীড়া সংস্থার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
রানা বলেন, "অনেক বছর আগে বাবার হাতে তৈরি মাটির বাড়িটি চাইলে ভেঙে আধুনিক পাকা বিল্ডিং করা যেত। কিন্তু বাবার স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়িটি ভাঙতে মন সায় দেয়নি। তাই বছরের পর বছর এটিকে রং-বার্নিশ করে নতুন রূপ দেই।"
বাড়ির সামনে সবুজ ঘাসে ঢাকা উঠোন, চারপাশে বিভিন্ন ফুল-ফলের গাছ। নীল-সাদা রঙে রাঙানো বাড়িটির টিনের চাল দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না এটি মাটি দিয়ে তৈরি। বরং প্রথম দেখায় যে কেউ মুগ্ধ হবে এর সৌন্দর্যে।
কালের বিবর্তনে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির বাড়ি আজ বিলুপ্তির পথে। এর মাঝে ক্রীড়া সংগঠক রানার মতো সন্তানের কাছে বাবার স্মৃতি হিসেবে টিকে থাকা এই বাড়িটি যেন এক টুকরো অতীত ও ভালোবাসা।