নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় দলগতভাবে বিএনপিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। যদিও দলে ফেরার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার দল বলতে কিছু নেই। এটা তারেক রহমান সাহেবের দল।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সরাইলের শাহবাজপুরে নিজ বাসভবনে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা জানান এবং জয়ের আনন্দ সবার মাঝে ভাগ করে নেয়ার আহ্বান জানান।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এই বিজয় আমি আমার নির্বাচনী এলাকার সব মানুষের প্রতি উৎসর্গ করছি। যারা জয়ী হয়েছেন, তারা শান্ত থাকবেন। যারা হুমকি দেয়, তারা কখনো জয়ী হয় না।’
তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে, চলাকালে ও পরে তার দলীয় নেতাকর্মীদের হুমকি-ধমকি দেয়া হয়েছে।
দলগত ভাবে বিএনপি সংসদে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে আপনার অবস্থান কেমন হবে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রুমিন বলেন, ‘আমার অবস্থান হবে একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের যেমন অবস্থান থাকে, তেমন। আমি কখনও কোনো অন্যায়কে অন্যায় দেখে চুপ থাকিনি। আমি যখন দলে ছিলাম, তখন আমি চাঁদাবাজি, জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছি।’
তিনি বলেন, ‘সরকারে কে আসলো, আর কে গেল সেটা আমার দেখার বিষয় না। আমি সরাইল-আশুগঞ্জের প্রতিনিধিত্ব করছি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ এর প্রতিনিধিত্ব করছি। আমার এলাকার স্বার্থ আমার মানুষের স্বার্থ সবার আগে।’
দলগতভাবে যদি বিএনপি আপনাকে আমন্ত্রণ জানায়, সেক্ষেত্রে আপনার অবস্থান কি হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আগে আমন্ত্রণ জানাক, তখন দেখা যাবে।’
ব্যারিষ্টার রুমিন বলেন, ‘নির্বাচনের জয়ের আগে আমাকে দলের পক্ষ থেকে নানা অফার দেয়া হয়েছিল। সেটা মন্ত্রিত্ব হতে পারে। তবে দলগত ভাবে বিএনপিকে অভিনন্দন জানাই।’
ব্যারিষ্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচনের কলঙ্কের ইতিহাস ১৯৭৩ সাল থেকে শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালে এসে একই জিনিস আমার সাথে হতে পারতো। আমি আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ জানাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যদি শক্ত হাতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না করত। যদি অসম্ভব রকম নিরপেক্ষতার সঙ্গে কোনো দল কোন ব্যক্তি না দেখে তারা র্যাপিড একশনে না যেত। তাহলে এই আসনে বিএনপি যথেষ্ট কারচুপির চেষ্টা করেছে। বিএনপির লোকাল নেতারা মানুষকে ঘরে ঘরে গিয়ে ভয় দেখিয়েছে। বিএনপির স্থানীয় নেতারা রাতে গিয়ে টাকা বিলি করেছে। বিএনপির নেতারা প্রত্যন্ত এলাকার ভোট কেন্দ্র ধামাউড়া ও দুবাজাইল কেন্দ্রে ভোট ছাপিয়েছে এবং তারা ফলাফল বিভিন্ন কেন্দ্রে আটকে রেখেছে। গতকাল রাতে সরাইল উচালিয়া পাড়ায় রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত আমি কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে পাঁচবারের মতো ফল গণনা করতে বাধ্য করেছি। দেখা গেছে বেশ কয়েকটি ভুয়া ব্যালট পেপারে তারা খেজুর গাছ মার্কায় দিয়ে এসেছে। তখন আমাকে বিএনপির লোকজন মারতে গিয়েছিল। সেনাবাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা ২৬ এর নির্বাচনে অনবদ্ধ এবং তাদেরকে স্যালুট জানাই, তাদের এই ভূমিকার জন্য।’
রুমিন বলেন, ‘আমি শুভেচ্ছা জানাই, যারাই ভালো ফলাফল করেছে, দল হোক ব্যক্তি হোক, যারা যারা ভালো ফলাফল করেছে, অবশ্যই তাদের প্রতি আমার শুভকামনা থাকবে এবং আমি আশা করবো, প্রত্যেকেই তার অবস্থান থেকে তার শপথ অনুযায়ী তার যে, দায়িত্ব ও কর্তব্য সেটা তারা পালন করবে।’
বিএনপিতে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমি ঘরের মেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার, আমি তো ঘরেই আছি। ঘরের মেয়েতো বাইরে যায়নি। আমি যদি গিয়ে সিলেট থেকে নির্বাচন করতাম, তাহলে বলতেন ঘরের মেয়ে বাইরে গেছে। আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে। আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া তে আছি। আমার দল তো আমাকে বহিষ্কার করে দিয়েছে। আমার দল বলতে কিছু নেই। এটা তারেক রহমান সাহেবের দল। উনি তো আমাকে বহিষ্কারই করে দিয়েছেন। এটাতো আমার দল না।’
নিজের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন অসম্ভব রকমের ভায়েস্ট ছিল। আমাকে প্রতি পদে পদে তারা থামানোর চেষ্টা করেছে। হেনস্থা করার চেষ্টা করেছে। এমনকি প্রশাসন ভোটের রাতের আগের দিন চেয়ারম্যানকে ডেকে নিয়ে বলেছে, আপনারা তো আমাদের লোক। আপনারা বুঝে ভোট দিয়েন। এরকম দুষ্টুমি প্রশাসন করেছে। আমি বলব, এই যে রাজনীতিবিদদের তাচ্ছিল্য করা এটা গত ১৫ বছরের সংস্কৃতি। কারণ গত ১৫ বছর প্রশাসনের ওপর ভর করে সরকার চলেছে। রাজনীতিবিদ নিজের জনপ্রিয়তায় জিতে আসতে পারে নাই। প্রশাসনের মুখে ঢুকে গেছে, তারাই সবকিছু। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া দুই আসনে তারা বুঝতে শুরু করেছে মানুষই সবকিছু। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কাজ করতে হলে প্রশাসনকে অন্তত এটা আমলে নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রশাসনের সব খরচাপাতি আসে দেশের সাধারণ একেবারে সাধারণ মানুষের আয় থেকে, সাধারণ মানুষের টাকা থেকে। এটা প্রশাসনকে বুঝে কাজ করতে হবে।’
বিএনপিতে ফেরা নিয়ে তিনি বলেন, ‘অভিমান শব্দটি অনেক দামি। ভীষণ আপন মানুষ ছাড়া অভিমান হয় না। বিরক্তি থাকতে পারে, অসন্তুষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু অভিমান কেন থাকবে অভিমান খুব দামি শব্দ। এটা যেখানে সেখানে ব্যবহার করা যায় না। আর দলের ব্যাপারে বলবো, দলের লড়াই সংগ্রাম ছিল ভোটের আন্দোলনের জন্য। আমাদের একটা ফ্রি ফেয়ার ইলেকশনের জন্য, সে আন্দোলনে আমি শরীক ছিলাম। দলের ১৮ মাসের কার্যক্রমে আমরা দেখেছি, কী করে মানুষের কাছ থেকে পয়সা আদায় করা যায়, কী করে লুট করা যায়, কী করে জমি দখল করা যায়, ব্যবসা দখল করা যায়, বালুর ব্যবসা করা যায়, কী করে দুর্নীতি করে পয়সা কামানো যায়, কী করে তদবিরবাজি করা যায়, কী করে চাঁদাবাজি করা যায়, এখন আপনারা কি বলতে চান আমি ওইগুলো সঙ্গী হব? তা তো নয় নিশ্চয়ই। আমার রাজনীতি আমার, দলের রাজনীতি দলের। আমি আশা করব তারা ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যে ভুলগুলো করেছে। তার পুনরাবৃত্তি তাদের হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত দেড় বছরে তারা মানুষের ওপর নানা রকমভাবে তারা মানুষকে বিরক্ত করেছে, সেটার আর পুনরাবৃত্তি হবে না। এটাই আমরা আশা করি এবং যে সুষ্ঠু ভোটের জন্য, এর জন্য তাদের এত লড়াই সংগ্রাম ১৭ বছরে, নির্বাচনে বিভিন্ন জায়গায় তাদের আচার-আচরণ খুব ভাল ছিল না। আওয়ামী লীগের ছায়া তো কিছু কিছু এখনই দেখতে পাচ্ছি। আশা করবো সেগুলো কম হবে বা ঘটবে না।’
জামায়াতের সংসদে যাবে কিনা এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছে, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা তো এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচনটা করলাম এবং আওয়ামী লীগসহ যে বাম দলগুলো আছে, তারা তো এই মুহূর্তে সংসদে নাই এবং জাতীয় পার্টি কয়টি আসন পেয়েছে সেটিও জানি না। সেটা যদি হয় তাহলে বিরোধী দলে কাউকে তো থাকতে হবে। সেটা কিভাবে হবে, সেটিও একটা বড় প্রশ্ন। দেখা যাক সময় বলবে।’
তিনি বলেন, ‘আমার নির্বাচনের অন্যতম অঙ্গীকার সরাইল-আশুগঞ্জকে মডেল উপজেলা হিসেবে দেখতে চাই। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। তাই আমি আশা করব আপনারা আমার হাতকে শক্তিশালী করবেন।’